মূল কনটেন্টে যান

বিয়েতে কত খরচ হয়? খাত ধরে ধরে বাজেট

ভেন্যু, খাবার, ফটোগ্রাফার, পোশাক: একটা বিয়েতে আসলে কত খরচ হয়, ৪০০ অতিথির একটা পূর্ণাঙ্গ হিসাব, প্রতি অতিথির খরচ, আর যে খরচগুলো সবাই ভুলে যান।

· 7 মিনিটে পড়া

প্রশ্নটা নিশ্চয়ই আগে কখনো গুগলে লিখেছেন, আর একটা "গড় খরচ" পেয়েছেন। সেটা আপনাদের প্রায় কোনো কাজে আসবে না। গ্রামের বাড়ির উঠোনে ৮০ জনের বিয়ে আর ঢাকার পাঁচতারা হোটেলের বলরুমে ১,০০০ অতিথির বিয়ের মধ্যে "বিয়ে" শব্দটা ছাড়া আর কোনো মিল নেই।

আসল প্রশ্ন বরং এটা: আপনাদের বিয়েতে একজন অতিথির পেছনে কত খরচ? এই সংখ্যাটা বের করলেই বাকি বাজেট পরিষ্কার হয়ে যায়। কীভাবে হিসাব করবেন তা দেখাচ্ছি, একটা পূর্ণাঙ্গ উদাহরণ আর যে খাতগুলো কোটেশনের হিসাব ওলটপালট করে দেয় সেগুলোসহ।

গড় হিসাব কেন বিভ্রান্ত করে

চারপাশে নানা সংখ্যা ঘোরে: "মধ্যবিত্ত বিয়েতে দশ-পনেরো লাখ টাকা লাগে।" ধরে নিলাম। কিন্তু এই গড়ে মেশানো আছে শুধু কাবিনের পর রেস্তোরাঁয় একবেলা খাওয়া, আর গায়ে হলুদ, মেহেদি, বিয়ে, বৌভাত মিলিয়ে চার দিনের আয়োজন। আপনাদের শহর, মৌসুম বা অতিথির সংখ্যা সম্পর্কে এটা কিছুই বলে না।

অথচ অতিথির সংখ্যাই সবচেয়ে বড় ব্যাপার। খাবার, পানীয়, প্লেট-গ্লাস, টেবিলের সংখ্যা, হলের আকার, কার্ড, মিষ্টির প্যাকেট: প্রায় সবকিছুই মাথাপিছু বাড়ে। অতিথি ৫০০ থেকে ৩৫০-এ নামালে যে সাশ্রয় হয়, সাজসজ্জার কোনো কৌশলে তা হয় না।

তাই শুরুতে মাত্র দুটো সংখ্যা ঠিক করতে বলি: মোট যে টাকাটা আপনারা সত্যিই জোগাড় করতে পারবেন (সঞ্চয়, দুই পরিবারের সাহায্য, সম্ভব হলে কোনো ঋণ ছাড়া), আর অতিথিদের একটা প্রাথমিক তালিকা, মোটামুটি হলেও চলবে।

৪০০ অতিথির বিয়েতে কত খরচ: একটা হিসাবসহ উদাহরণ

ধরা যাক এক দম্পতি, নাম দিই নুসরাত আর আরিফ। ডিসেম্বরের এক শুক্রবার, ঢাকার একটা কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ের অনুষ্ঠান, ৪০০ অতিথি, কাচ্চি বিরিয়ানির মেন্যু। আগের সন্ধ্যায় বাড়ির ছাদে ছোট্ট করে গায়ে হলুদ। তাঁরা চান "গোছানো, পরিপাটি" একটা আয়োজন, রাজকীয়ও নয়, জোড়াতালিও নয়। নিচের অঙ্কগুলো এ ধরনের বিয়ের জন্য বাস্তবসম্মত অনুমান, নির্দিষ্ট কোনো দরদাম নয়: আপনাদের কোটেশন আলাদা হবে। কনের সোনার গয়না এখানে ধরা হয়নি, কারণ অনেক পরিবারে সেটা আলাদা হিসাবে চলে।

খাতউদাহরণের অঙ্কমোটের অংশ
খাবার ও পানীয় (৪০০ × ৯০০ টাকা)৩,৬০,০০০ টাকা৪০%
কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া১,২০,০০০ টাকা১৩%
বর-কনের পোশাক ও আনুষঙ্গিক১,২০,০০০ টাকা১৩%
ছবি ও ভিডিও৮০,০০০ টাকা৯%
গায়ে হলুদের আয়োজন৮০,০০০ টাকা৯%
স্টেজ, ফুল ও সাজসজ্জা৭০,০০০ টাকা৮%
কনের সাজ (মেকআপ ও চুল)২৫,০০০ টাকা৩%
বিয়ের কার্ড২০,০০০ টাকা২%
গাড়ি, গাড়ি সাজানো ও যাতায়াত১৫,০০০ টাকা২%
কাবিন ও রেজিস্ট্রেশন১০,০০০ টাকা১%
মোট৯,০০,০০০ টাকা

অর্থাৎ প্রতি অতিথি ২,২৫০ টাকা। নুসরাত আর আরিফ এই সংখ্যাটাই মাথায় রেখেছিলেন, আর এটা দিয়েই পারিবারিক তর্কগুলো মিটিয়েছেন, যেমন "চট্টগ্রামের খালাতো ভাইদের তো বাদ দেওয়া যায় না।" আরও ২০ জন অতিথি মানে প্রায় ৪৫,০০০ টাকা। এভাবে বললে আলোচনার সুরটাই বদলে যায়।

অপ্রত্যাশিত খরচের জন্য তাঁরা ১০% বাড়তি রেখেছিলেন, মানে ৯০,০০০ টাকা। এ নিয়ে নিচে আবার বলব, কারণ এই বাড়তি টাকাটা সবসময়ই কাজে লাগে।

খাত ধরে ধরে বাজেট

খাবার: যে খাত সব ঠিক করে দেয়

বেশির ভাগ বিয়েতে খাবার আর পানীয়ে মোট খরচের এক-তৃতীয়াংশ থেকে অর্ধেক যায়। ক্যাটারারের কোটেশন হয় প্লেট হিসেবে, আর দামের পরিসর অনেক বড়: ঢাকায় কাচ্চি, রোস্ট, রেজালা, বোরহানি আর দই-মিষ্টির একটা সাধারণ মেন্যুতে অনেক দম্পতি প্লেটপ্রতি ৬০০ থেকে ১,৫০০ টাকার প্রস্তাব পান, আর কলকাতায় বাঙালি ভোজের প্লেট ৮০০ থেকে ২,০০০ টাকার মধ্যে ঘোরে। তবে সবকিছু নির্ভর করে কী কী ধরা আছে তার উপর।

প্রতিটি কোটেশন লাইন ধরে পড়ুন। যে প্রশ্নগুলোতে আসল পার্থক্য ধরা পড়ে:

  • পরিবেশনকারী (বেয়ারা) কি দামের মধ্যে, আর কতক্ষণের জন্য? নির্ধারিত সময়ের পর বাড়তি ঘণ্টার জন্য আলাদা টাকা লাগে কি না।
  • প্লেট, গ্লাস, টেবিলক্লথ, চেয়ার-কভার কি তাঁরা দেবেন, নাকি ভাড়া নিতে হবে?
  • কোমল পানীয়, পানি, বোরহানি কি প্লেটের দামে, নাকি আলাদা?
  • মিষ্টি বা দই বাইরে থেকে আনলে কোনো চার্জ আছে কি না।
  • শিশুদের প্লেট আর ফটোগ্রাফার, ড্রাইভার, সাহায্যকারীদের খাবার কি হিসাবে আছে?

প্লেটপ্রতি ৯০০ টাকার দুটো কোটেশন সব যোগ করার পর ২০০ টাকা ব্যবধানে গিয়ে ঠেকতে পারে।

ভেন্যু

মৌসুম আর দিনভেদে দাম খুব বদলায়। শীতের শুক্রবার, বিশেষ করে ডিসেম্বর-জানুয়ারির বিয়ের মৌসুমে, অন্য মাসের কোনো সাধারণ দিনের চেয়ে অনেক বেশি দামি। পশ্চিমবঙ্গে পঞ্জিকার শুভ দিনগুলোতে ভেন্যু পাওয়াই কঠিন। আপনাদের তারিখ যদি একেবারে নড়চড়হীন না হয়, অফ-সিজন আর সপ্তাহের মাঝের দিনের দর অবশ্যই জিজ্ঞেস করুন: এর চেয়ে সহজ দরকষাকষি আর নেই।

ভাড়ার মধ্যে কী কী আছে দেখে নিন। কিছু কমিউনিটি সেন্টার নিজেদের ক্যাটারার বাধ্যতামূলক করে, কিছু জায়গায় রাত দশটার পর অনুষ্ঠান চলে না, কেউ জেনারেটর বা পরিষ্কারের জন্য আলাদা টাকা নেয়। সস্তা ভেন্যু যদি দামি ক্যাটারার চাপিয়ে দেয়, সেটা আর সস্তা থাকে না।

ফটোগ্রাফার ও ভিডিওগ্রাফার

অনেক বর-কনের মতে, এই খাতে টাকা বাঁচিয়েই সবচেয়ে বেশি আফসোস হয়। ছবি থেকে যায়, স্টেজের ফুল থাকে না। একই রকম সেবার মধ্যে তুলনা করুন: কত ঘণ্টা থাকবেন, কয়টা এডিট করা ছবি দেবেন, কতদিনে দেবেন, অ্যালবাম আর সিনেমাটিক ভিডিও ধরা আছে কি না, গায়ে হলুদ আলাদা দিনে হলে সেটা ধরা আছে কি না।

পোশাক, আংটি, সাজ

কনের বেনারসি বা লেহেঙ্গার দিকেই সবার নজর থাকে, কিন্তু সব যোগ করুন: হলুদের শাড়ি, বৌভাতের শাড়ি, ব্লাউজ সেলাই, ওড়না, জুতা, বরের শেরওয়ানি, পাগড়ি, নাগরা, তারপর ট্রায়াল মেকআপ। এই ছোট ছোট অঙ্কগুলোই হিসাব ছাপিয়ে যায়।

বাকি সব: গান-বাজনা, ফুল, কার্ড

ডিজে বা গানের দলের দাম সময় ধরে দরকষাকষি করা যায়। ফুলের ক্ষেত্রে একটা কৌশল কাজ করে: হলুদের সাজের তাজা ফুল আর গাঁদার মালা পরের দিন বিয়ের গেট বা টেবিলে আবার ব্যবহার করুন। কার্ডের ক্ষেত্রে ছাপানো কার্ড আর মেসেজে পাঠানো ডিজিটাল কার্ডের মধ্যে বেছে নেওয়ায় খরচ পুরোপুরি বদলে যায়; এ নিয়ে লিখেছি আমাদের বিয়ের কার্ড বিষয়ক লেখায়।

যে খরচগুলো সবাই ভোলেন (আর বাজেট ছাপিয়ে যায়)

প্রায় সব দম্পতিই প্রথম বাজেট ছাড়িয়ে যান। সাধারণত কোনো বড় খাতের জন্য নয়, বরং শুরুর হিসাবে না থাকা ছোট ছোট লাইনের জমে ওঠায়।

ভ্যাট ছাড়া কোটেশন। কিছু ভেন্যু আর ক্যাটারার ভ্যাট বাদ দিয়ে দাম বলেন। বাংলাদেশে ১৫% ভ্যাট যোগ হলে ১,০০,০০০ টাকার কোটেশন দাঁড়ায় ১,১৫,০০০ টাকায় (পশ্চিমবঙ্গে জিএসটিও একইভাবে যোগ হয়)। সবসময় ভ্যাটসহ মোট অঙ্ক জিজ্ঞেস করুন।

বৌভাত বা ওয়ালিমা। এটা যদি একই বাজেটে পড়ে, তাহলে আলাদা ভেন্যু, আলাদা খাবার, আলাদা সাজ, প্রায় আরেকটা বিয়ে।

দিনের টুকিটাকি। বদলানোর জন্য বাড়তি পোশাক, জরুরি কিট, তত্ত্বের ডালা সাজানো, বর-কনের বন্ধুদের উপহার, বেয়ারা-ড্রাইভারদের বকশিশ, গেটে টাকা ধরার খরচ, স্বাগত বোর্ড, ছাপানো বসার তালিকা।

যাতায়াত। শহরের বাইরের ফটোগ্রাফার বা ডেকোরেটরের যাতায়াত খরচ, দূরের আত্মীয়দের জন্য মাইক্রোবাস বা থাকার ব্যবস্থা।

ফেরতযোগ্য নয় এমন অগ্রিম। মাঝপথে তারিখ বা ভেন্যু বদলালে আগে দেওয়া অগ্রিম প্রায়ই আর ফেরত পাওয়া যায় না।

তাই ১০% বাড়তি রাখুন। বিয়ের আগের রাত পর্যন্ত যদি কাজে না লাগে, তো ভালোই: সেটা দিয়ে হানিমুন হবে।

রাতের পর রাত না জেগে বাজেট ভাগ করার উপায়

একটা সহজ পদ্ধতি, তিন ধাপে।

প্রথমে মোট অঙ্কটা ঠিক করুন আর সঙ্গে সঙ্গে ১০% সরিয়ে রাখুন। বাকিটাই আপনাদের কাজের বাজেট।

তারপর এই বাজেট খাত অনুযায়ী ভাগ করুন, প্রচলিত অনুপাত থেকে শুরু করে (উপরের ছকটা তার একটা উদাহরণ), তারপর নিজেদের অগ্রাধিকার অনুযায়ী বদলান। যে দম্পতি গানপাগল, তাঁরা গান-বাজনায় বেশি আর ফুলে কম রাখবেন। এটাই ঠিক পথ: একসঙ্গে বসে ঠিক করুন কোন দুই-তিনটে খাত আপনাদের কাছে সত্যিই জরুরি, আর বাকিগুলোয় সংযমী হোন।

শেষে একটা নয়, তিনটে কলাম রাখুন: পরিকল্পিত, প্রকৃত (চুক্তি সই হওয়ার পর) আর পরিশোধিত (অগ্রিম দেওয়া হয়েছে)। বিয়ের বেশির ভাগ হিসাবের খাতা প্রথম কলামেই থেমে যায়, আর তাই তিন মাস পরে সেটা আর কোনো কাজে আসে না।

দুজনে মিলে একটা স্প্রেডশিট চালাতে না চাইলে, iPlanMyWedding-এর বিয়ের বাজেট আপনাদের মোট অঙ্ক থেকে খাতভিত্তিক একটা প্রাথমিক ভাগ করে দেয়, তারপর পরিকল্পিত, প্রকৃত আর অগ্রিমের হিসাব রাখে, সঙ্গীর সঙ্গে শেয়ার করে। কাগজে-কলমেও একই কাজ করা যায়, আসল কথা হলো তিনটে কলাম থাকা।

যেখানে টাকা বাঁচালে চোখে পড়ে না

এমন সাশ্রয় আছে যা বিয়ের দিন কারও চোখে পড়ে না, আর সেগুলো "নিজে হাতে বানানোর" কৌশলের চেয়ে বেশি কার্যকর, যেগুলোতে প্রায়ই পুরো সপ্তাহান্ত চলে যায়।

  • অতিথির তালিকা ছোট করা, এটাই সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
  • শুক্রবার বা শুভ দিনের বদলে অন্য দিন, কিংবা ভরা মৌসুমের বাইরের মাস বেছে নেওয়া।
  • গায়ে হলুদ আর মেহেদি একসঙ্গে, বাড়িতে বা ছাদে করা।
  • মেন্যুতে পদের সংখ্যা কমানো: চার-পাঁচটা ভালো পদ দশটা মাঝারি পদের চেয়ে বেশি মনে থাকে।
  • বন্ধুদের ডিজিটাল কার্ড পাঠানো আর ছাপানো কার্ড রাখা মুরব্বি আর নিকটাত্মীয়দের জন্য।

উল্টো দিকে, ফটোগ্রাফার আর অতিথিদের আরামে (বসার জায়গা, পাখা বা এসি, শীতে উষ্ণতা) কাটছাঁট না করার পরামর্শ দিই। এই দুটো জিনিসই সবার মনে থাকে।

কোন খরচ কখন, কোন অগ্রিম কবে দেবেন তা সাজাতে আমাদের বিয়ের পরিকল্পনার সময়সূচি মাস ধরে ধরে সব তারিখ দেখায়।

সাধারণ প্রশ্ন

প্রথা অনুযায়ী বিয়ের খরচ কে দেয়?

এখন আর বাঁধাধরা নিয়ম নেই। প্রথা ছিল বিয়ের অনুষ্ঠান কনের বাড়ি করবে আর বৌভাত বা ওয়ালিমা বরের বাড়ি, কিন্তু আজকাল অনেক দম্পতি বড় অংশটা নিজেরাই বহন করেন, দুই পরিবারের সাহায্য নিয়ে। বাবা-মা অংশ নিলে শুরুতেই পরিষ্কার করে নিন তাঁরা একটা নির্দিষ্ট অঙ্ক দেবেন নাকি নির্দিষ্ট কোনো খাত দেখবেন: তাহলে সব বিষয়ে তাঁদের মতামত চাপানোর সুযোগ কমে।

শুধু রেজিস্ট্রি বা কাবিন করে বিয়েতে কত খরচ?

কাজী বা ম্যারেজ রেজিস্ট্রারের ফি সরকার নির্ধারিত, আর বাংলাদেশে তা দেনমোহরের অঙ্কের উপর নির্ভর করে; পশ্চিমবঙ্গে রেজিস্ট্রি বিয়ের সরকারি ফিও সামান্য। আসল খরচ আসে তারপরের আয়োজন থেকে: ৩০ জনের জন্য একটা রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাওয়া, সাদামাটা পোশাকসহ, এক লাখ টাকার নিচেও রাখা যায়।

উপহারের তালিকার জন্য কি বাজেট রাখতে হয়?

না, তবে অনলাইন তহবিল কখনো কখনো চার্জ কাটে। বেছে নেওয়ার আগে তুলনা করুন, বিস্তারিত আছে নগদ তহবিল নাকি উপহারের তালিকা লেখায়।

এক জায়গাতেই বিয়ের আয়োজন করুন

অতিথি তালিকা, বাজেট, চেকলিস্ট, RSVP-সহ বিয়ের ওয়েবসাইট: শুরু করতে সবকিছুই বিনামূল্যে।

বিনামূল্যে শুরু করুন