বিয়ের ওয়েবসাইটে কী রাখবেন? যে অংশগুলো সত্যিই কাজের
অনুষ্ঠানসূচি, লোকেশন, থাকার ব্যবস্থা, পোশাকের রং, বাচ্চারা, RSVP: সত্যিই কাজের একটা বিয়ের ওয়েবসাইটের অংশগুলো, নিজেদের মতো বদলে নেওয়ার নমুনা লেখাসহ।
· 6 মিনিটে পড়া
বিয়ের ওয়েবসাইট সফল হতে সুন্দর হওয়ার দরকার নেই। দরকার আপনাদের হয়ে অতিথিদের সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া। সব প্রশ্নের।
একটা অনুশীলন করুন: বিয়ের আগের সপ্তাহগুলোতে কী কী মেসেজ আসবে কল্পনা করুন। "গাড়ি কোথায় রাখব?", "বাচ্চাদের নিয়ে আসা যাবে?", "কাছে কোনো হোটেল আছে?", "হলুদে কী রঙের পোশাক পরব?"। ফোনে বা হোয়াটসঅ্যাপে আসা প্রতিটি প্রশ্ন মানে আপনাদের ওয়েবসাইটে একটা অংশ নেই।
আমরা যা রাখতাম, অতিথিরা যে ক্রমে খোঁজেন সেই ক্রমে।
আসল কথা, স্ক্রল না করেই চোখে পড়ার মতো
প্রথম পাতার একেবারে উপরে, কোনো ক্লিক ছাড়াই: আপনাদের নাম, তারিখ, শহর। আর দাওয়াতের উত্তর দেওয়ার একটা বোতাম। ব্যস।
এরপর যা আসবে তা লম্বা হতে পারে, কিন্তু এই চারটে তথ্য ফোনের পর্দায় সঙ্গে সঙ্গে চোখে পড়া চাই, কারণ বেশির ভাগ অতিথি লিংকটা ফোনেই খুলবেন। কম্পিউটারের সামনে বসে প্রায় কেউই বিয়ের ওয়েবসাইট পড়েন না।
অনুষ্ঠানসূচি
ঘণ্টা ধরে ধরে, প্রতিটি অনুষ্ঠানের জায়গাসহ। অতিথিরা জানতে চান কখন পৌঁছাবেন, কোন অনুষ্ঠান কতক্ষণ চলবে, আর এক অনুষ্ঠান থেকে আরেকটার মাঝে বাসায় ফিরে কাপড় বদলানোর সময় আছে কি না।
একটা পরিষ্কার অনুষ্ঠানসূচির উদাহরণ:
বৃহস্পতিবার, ৯ ডিসেম্বর: গায়ে হলুদ
- সন্ধ্যা ৬টা: কনের বাড়ির ছাদে হলুদের আয়োজন
- রাত ৮টা: গান, নাচ আর রাতের খাবার
শুক্রবার, ১০ ডিসেম্বর: বিয়ে
- দুপুর ১২টা: বরযাত্রীর আগমন, রাজমহল কমিউনিটি সেন্টার
- দুপুর ১২টা ৩০: আকদ ও কাবিন
- দুপুর ১টা ৩০: খাওয়াদাওয়া
- বিকেল ৪টা: কনে বিদায়
রবিবার, ১২ ডিসেম্বর: বৌভাত
- সন্ধ্যা ৭টা: বরের বাড়ির পক্ষ থেকে অভ্যর্থনা, গুলশান ক্লাব
কিছু অতিথি যদি শুধু বিয়েতে দাওয়াত পান, তাঁদের হলুদের সূচি দেখাবেন না। এটা সত্যিকারের একটা বিষয়, আর এমন ওয়েবসাইট বেছে নেওয়ার একটা বড় কারণ যেখানে প্রতিটি পরিবার শুধু নিজের দাওয়াতের অনুষ্ঠানগুলোই দেখে।
লোকেশন, পার্কিং, যাতায়াত
শুধু ঠিকানা যথেষ্ট নয়। যোগ করুন:
- প্রতিটি জায়গার জন্য গুগল ম্যাপের লিংক (কনের বাড়ি, কমিউনিটি সেন্টার, বৌভাতের ভেন্যু);
- গাড়ি কোথায় রাখবেন, বিশেষ করে পার্কিং যদি সীমিত হয় বা গলির ভেতরে হয়;
- একটা চেনা ল্যান্ডমার্ক ("অমুক মসজিদের পাশের গলি"), কারণ আমাদের শহরে ঠিকানার চেয়ে ল্যান্ডমার্ক বেশি কাজ করে;
- কাছের বাস স্ট্যান্ড, মেট্রো বা স্টেশন আর সেখান থেকে রিকশা বা উবারে কতক্ষণ;
- বরযাত্রী বা অতিথিদের জন্য মাইক্রোবাস থাকলে, কখন কোথা থেকে ছাড়বে আর কখন ফিরবে।
শেষ কথাটা তুচ্ছ নয়। ঢাকার জ্যাম বা কলকাতার ভিড়ে অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথটাই অনেক অতিথির সবচেয়ে বড় চিন্তা, অথচ কেউ জিজ্ঞেস করতে চান না।
থাকার ব্যবস্থা
অনেক অতিথি যদি অন্য শহর বা বিদেশ থেকে আসেন, এই অংশটাই সবচেয়ে বেশি দেখা হবে। নানা দামের তিন-চারটে বিকল্প দিন: আত্মীয়ের বাসায় থাকার ব্যবস্থা থাকলে সেটা, ভেন্যুর কাছের একটা হোটেল, একটা গেস্টহাউস, বাজেটে থাকতে চাওয়া বন্ধুদের জন্য একটা সাধারণ বিকল্প। গাড়িতে কতক্ষণ লাগে তা লিখুন।
হোটেলের সঙ্গে বিশেষ দর ঠিক করে থাকলে বা কয়েকটা রুম আটকে রাখলে, কতদিন পর্যন্ত বুকিং করা যাবে তা জানান। আর আশপাশে থাকার জায়গা কম হলে, সেভ-দ্য-ডেট পাঠানোর সময়েই এই অংশটা অনলাইনে দিন।
পোশাকের নির্দেশনা, সহজ ভাষায়
"এথনিক ফর্মাল" বা "সেমি-ফর্মাল" সবার কাছে কিছু বোঝায় না। বাস্তব পরামর্শে বদলে দিন:
হলুদে হলুদ বা কমলা রঙের শাড়ি-পাঞ্জাবি পরলে খুব ভালো লাগবে। অনুষ্ঠানটা খোলা ছাদে, ডিসেম্বরের সন্ধ্যায় বেশ ঠান্ডা পড়ে, একটা শাল বা জ্যাকেট সঙ্গে রাখবেন।
একটা চলতি শব্দের চেয়ে দুটো কাজের বাক্য অনেক ভালো। কোনো বিশেষ অনুরোধ থাকলে (দুই পরিবারের মিলিয়ে কোনো রং, লাল শুধু কনের জন্য, কোনো থিম), কোনো কৈফিয়ত ছাড়া সহজভাবে বলুন।
বাচ্চারা: পরিষ্কার করে লিখুন
এই অংশটাই সবচেয়ে বেশি এড়িয়ে যেতে ইচ্ছে করে, আর এটাকেই সবচেয়ে কম এড়ানো উচিত। আমাদের বিয়েতে বাচ্চারা প্রায় সবসময়ই দাওয়াত পায়, তাই কোনো অনুষ্ঠান যদি শুধু বড়দের জন্য হয়, আন্তরিকভাবে কিন্তু স্পষ্ট করে বলুন:
হলুদের পরের রাতের আড্ডাটা আমরা শুধু বড়দের জন্য রাখছি। জানি কারও কারও জন্য এতে একটু ব্যবস্থা করতে হবে, আপনাদের বোঝাপড়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ। বিয়ে আর বৌভাতে অবশ্যই বাচ্চাদের নিয়ে আসবেন।
বাচ্চারা দাওয়াত পেলে তাদের জন্য কী থাকছে তা জানান (খেলার জায়গা, বাচ্চাদের খাবার, ঘুমানোর একটা ঘর)। জানা থাকলে বাবা-মায়েরা ভালোভাবে গুছিয়ে নিতে পারেন।
অনলাইন RSVP
আপনাদের ওয়েবসাইট যদি একটাই কাজ করে, সেটা হোক এটা। ওয়েবসাইটে উত্তরের একটা ফর্ম থাকলে এসএমএস, হোয়াটসঅ্যাপ, ফোনকল আর পারিবারিক দাওয়াতে মুখে মুখে পাওয়া উত্তর জোড়া লাগাতে হয় না।
শুধু যা দরকার তা-ই জিজ্ঞেস করুন: প্রতিটি অনুষ্ঠানে আসছেন কি না, পরিবারের কতজন, খাবারের বিধিনিষেধ বা অ্যালার্জি, দরকার হলে মেন্যু বাছাই। প্রতিটি বাড়তি প্রশ্ন উত্তর পিছিয়ে দেওয়ার একটা কারণ। পরের ধাপ আর মনে করানোর জন্য দেখুন আমাদের দাওয়াতের উত্তর সামলানো বিষয়ক লেখা।
উপহারের তালিকা বা নগদ তহবিল
একটা আলাদা অংশ, সহজ সুরে। উপহারের বদলে তহবিল বেছে নেওয়ার জন্য লম্বা কৈফিয়তের দরকার নেই। এক বাক্যই যথেষ্ট: "আপনাদের উপস্থিতি আর দোয়াই আমাদের সবচেয়ে বড় উপহার। যাঁরা চান, তাঁদের জন্য আমরা মালদ্বীপ ঘোরার একটা তহবিল খুলেছি।" দুটোর মধ্যে এখনো দ্বিধায় থাকলে, বিকল্পগুলো তুলনা করেছি নগদ তহবিল নাকি উপহারের তালিকা লেখায়।
বাকি সবকিছুর জন্য একটা প্রশ্নোত্তর অংশ
যে প্রশ্নগুলোর জন্য আলাদা পাতা লাগে না, সেগুলো এখানে একসঙ্গে রাখুন। প্রায়ই আসে এমন কয়েকটা:
- সঙ্গে কাউকে নিয়ে আসা যাবে?
- কাপড় বদলানোর বা নামাজ পড়ার জায়গা আছে?
- ভেন্যুতে লিফট বা হুইলচেয়ারে চলাচলের ব্যবস্থা আছে?
- বিয়ের দিন কোনো সমস্যা হলে কার সঙ্গে যোগাযোগ করব? (কোনো ভাই বা বন্ধুর নম্বর দিন, নিজেদের নয়।)
- অনুষ্ঠানের সময় ছবি তোলা যাবে?
যা ঐচ্ছিক
"আমাদের গল্প", এনগেজমেন্ট বা পানচিনির ছবির গ্যালারি, বর-কনের বন্ধুদের পরিচয়: এগুলো ভালো লাগে, ওয়েবসাইটে ব্যক্তিত্ব আনে, কিন্তু না থাকলে কেউ কিছু মনে করবেন না। লিখলে "আমাদের গল্প" ছোট রাখুন। তিন অনুচ্ছেদ, একটা মজার ঘটনা, আত্মজীবনী নয়।
বিয়ের পরে ওয়েবসাইটের একটা দ্বিতীয় জীবন হতে পারে: একটা পাতা যেখানে অতিথিরা দিনের ছবিগুলো রেখে যান। এ নিয়ে লিখেছি অতিথিদের কাছ থেকে বিয়ের ছবি সংগ্রহ লেখায়।
যা প্রকাশ না করাই ভালো
বিয়ের ওয়েবসাইটে ব্যক্তিগত তথ্য থাকে: আপনাদের নাম, একটা তারিখ, এমন একটা দিন যখন বাসায় কেউ থাকবে না, কখনো পরিবারের ছবি। কয়েকটা সাধারণ সাবধানতা:
পাসওয়ার্ড দিয়ে সুরক্ষিত রাখুন। কার্ডে লিখে দেওয়া একটা পাসওয়ার্ডই অপরিচিত কৌতূহলীদের দূরে রাখতে যথেষ্ট।
অতিথিদের তালিকা সবার দেখার মতো করে রাখবেন না।
গুগলে খুঁজে পাওয়ার মতো করবেন না, যদি না সত্যিই চান।
বাসার ঠিকানা নিজেদের কাছেই রাখুন। যে অতিথিরা উপহার পাঠাতে চান, তাঁরা চেয়ে নেবেন।
কখন অনলাইনে দেবেন?
দুই ধাপে। প্রথম সংস্করণ, তারিখ, জায়গা আর থাকার ব্যবস্থাসহ, সেভ-দ্য-ডেট পাঠানোর সময়, ৪ থেকে ৬ মাস আগে। পূর্ণ সংস্করণ, বিস্তারিত অনুষ্ঠানসূচি আর RSVP-সহ, কার্ড পাঠানোর সময়। আমাদের বিয়ের পরিকল্পনার সময়সূচি এই ধাপগুলো সাজাতে সাহায্য করবে।
পরিবারের একটা অংশ বাংলা না পড়লে ভাষার কথা ভাবুন। লন্ডন বা নিউ ইয়র্কে বড় হওয়া চাচাতো ভাইবোন থাকলে ইংরেজিতে ওয়েবসাইট দিলে অনেক সুবিধা হবে, অন্তত অনুষ্ঠানসূচি আর লোকেশনের জন্য।
iPlanMyWedding-এর বিয়ের ওয়েবসাইট এই সব অংশ, পরিবার আর অনুষ্ঠানভিত্তিক RSVP, পাসওয়ার্ড সুরক্ষা আর একাধিক ভাষা একসঙ্গে দেয়। তবে যে মাধ্যমই ব্যবহার করুন, নিয়ম একটাই: যে প্রশ্ন আপনাদের দুবার শুনতে হয়, তা ওয়েবসাইটে এক লাইনের যোগ্য।
সাধারণ প্রশ্ন
বিয়ের ওয়েবসাইটের জন্য কি নিজস্ব ডোমেইন লাগে?
না। কোনো বিয়ের ওয়েবসাইট সেবায় "নাম-আর-নাম" ধরনের একটা ঠিকানাই যথেষ্ট। কার্ডে ছাপানোর জন্য ছোট একটা ঠিকানা চাইলে নিজস্ব ডোমেইন একটা বাড়তি সুবিধা।
বিয়ের পরে কতদিন ওয়েবসাইট অনলাইনে রাখা উচিত?
কয়েক মাস, ছবি শেয়ার করা আর অতিথিদের ধন্যবাদ জানানো পর্যন্ত। তারপর আপনাদের ইচ্ছা: অনেক দম্পতি স্মৃতি হিসেবে রেখে দেন।